পেয়ারা(Guavas/Guajava) খেতে ভালবাসেনা এমন মানুষ পাওয়াটা দুস্কর। সুস্বাদু রসালো ডাঁসা পেয়ারার স্বাদের জন্যই এটি অতি জনপ্রিয়৷ তবে শুধু স্বাদ নয় পুষ্টিগুণেও ভরা৷ ভিটামিন C তে ঠাসা এই ফলে রয়েছে প্রচুর ফাইবার। পেয়ারা হার্টও ভাল রাখে। পেয়ারা রক্তে শর্করার মাত্রা কম করে। এটি একটি পুষ্টিকর ফল। এটি ভিটামিন সি, ক্যারোটিনয়েডস, ফোলেট, পটাশিয়াম, আঁশ এবং ক্যালসিয়াম প্রভৃতিতে সমৃদ্ধ। একশ’ গ্রাম পেয়ারায় দুইশ’ মি.গ্রা. ভিটামনি সি আছে অর্থাৎ পেয়ারায় কমলার চেয়ে ৪গুণ বেশি ভিটামিন সি আছে। পেয়ারার খোসায় কমলায় চেয়ে পাঁচগুণ বেশি ভিটামিন সি থাকে। এই ফলে লৌহ উপাদানও পর্যাপ্ত পরিমাণে বিদ্যমান। পেয়ারাতে প্রচুর পরিমাণে এন্টিঅক্সিডেন্ট ও পলিফেনল আছে যা ক্যান্সার প্রতিরোধক। রোগ প্রতিরোধে পেয়ারার অনেক গুণ রয়েছে। পেয়ারার বীজে ওমেগা-৩ ও ওমেগা-৬ পলিআন-সেচুরেটেড ফ্যাটি এসিড ও আঁশ বিদ্যমান। পেয়ারা পাতার রস ক্যান্সার প্রতিরোধী এবং সংক্রমণ, প্রদাহ, ব্যথা জ্বর, বহুমূত্র, আমাশয় প্রভৃতি রোগে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। । তবে আর একটা বিষয় জেনে রাখা ভাল যে বর্তমানে ভারতবর্ষের পশ্চিমবঙ্গের বারুইপুর অঞ্চলের সুস্বাদু রসালো পেয়রা সারা পৃথিবী সুনাম পাচ্ছে। শুধু তাই নয় বারুইপুর অঞ্চলের সুস্বাদু রসালো পেয়ারা সারা পৃথিবীতে এক্সপোর্টও হচ্ছে।
পেয়ারা বা গয়া (বৈজ্ঞানিক নাম- Psidium guajava) সাধারণত সবুজ রঙের হয়, তবে অন্যান্য বর্ণের পেয়ারাও দেখতে পাওয়া যায়। লাল পেয়ারাকে (Marroonguava) রেড আপেলও বলা হয়। পেয়ারার প্রায় ১০০টিরও বেশি প্রজাতি আছে। মেক্সিকো, মধ্য আমেরিকা, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া প্রভৃতি স্থানে পেয়ারা বেশি জন্মায়।
পেয়ারার পুষ্টগুন তালিকাঃ
পেয়ারার পুষ্টিগুণ এর আকারের ওপরেও নির্ভর করে। আমরা ১০০ গ্রাম ওজনের একটি পেয়ারা কত পরিমান পুষ্টিগুন আছে তা নিম্নে আলোচনা করা হল।
- ক্যালোরিঃ ৬৮
- কার্বোহাইড্রেটঃ ১৪.৩২ গ্রাম
- ফাইবারঃ ৫.৪ গ্রাম
- চিনিঃ ৮.৯২ গ্রাম
- প্রোটিনঃ ২.৫৫ গ্রাম
- চর্বিঃ ০.৯৫ গ্রাম
- ভিটামিন সিঃ ২২৮.৩ মিলিগ্রাম
- ভিটামিন-এঃ ৬২৪ মিলিগ্রাম
- ফোলেটঃ ৪৯ মাইক্রোগ্রাম
- পটাসিয়ামঃ ৪১৭ মিলিগ্রাম
- ম্যাগনেসিয়াম: ২২ মিলিগ্রাম
- থায়ামিন-বি ১ ০.০৬৭ মিগ্রা
- নায়াসিন-বিঃ ১.০৮৪ মিগ্রা
- ক্যালসিয়ামঃ ১৮ মিগ্রা
- লৌহঃ ০.২৬ মিগ্রা
- ম্যাগনেসিয়ামঃ ২২ মিগ্রা
- ম্যাঙ্গানিজঃ ০.১৫ মিগ্রা
- ফসফরাসঃ ৪০ মিগ্রা
- পটাসিয়ামঃ ৪১৭ মিগ্রা
- সোডিয়ামঃ ২ মিগ্রা
- জিংকঃ ০.২৩ মিগ্রা
উৎস: ইউএসডিএ ফুডডাটা সেন্ট্রাল
পেয়ারার অবিশ্বাস্য গুণঃ
রক্তে শর্করার নিয়ন্ত্রণে উপকারিঃ
পেয়ারার ফাইবার রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে। অর্থাৎ ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য পেয়ারা উপকারী। লাইকোপেন(Lycopene), কোয়ারকেটিন(Quercetin), ভিটামিন সি এবং আরো কিছু পলিফেনল আছে যা কিনা শক্তিশালী এন্টি-অক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে আর এই এন্টি-অক্সিডেন্ট ক্যান্সার হওয়ার ঝুকি কমায়। বিশেষ করে প্রোস্টেট ক্যান্সার কমাতে অনেক সাহায্য করে পেয়ারা। আর সেই সাথে পেয়ারা খেলে মেয়েদের ব্রেস্ট ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে। পেয়ারাতে ফাইবার এবং কম গ্লাইসেমিক ইনডেক্স থাকার কারণে এটি খেলে রক্তে শর্করার পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে থাকে আর তাই ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুকি কিছুটা কম থাকে।
চোখের জন্য উপকারিঃ
পেয়ারাতে থাকে ভিটামিন A। দৃষ্টিশক্তি বজায় রাখতে এবং বয়স-সম্পর্কিত ম্যাকুলার অবক্ষয় প্রতিরোধের জন্য অপরিহার্য। তাছাড়া এটি খেলে চোখের ছানি হওয়ার সম্ভাবনা অনেকটা কমে যায়।
ব্লাড প্রেশার নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করেঃ
পেয়ারা শরীরের সোডিয়াম এবং পটাশিয়াম এর ব্যালান্স বাড়ায়,যা কিনা ব্লাড প্রেশার নিয়ন্ত্রণ করে যাদের উচচ রক্তচাপ আছে। পেয়ারা ট্রাইগ্লিসারাইড এবং LDL নামক একটি খারাপ কোলেস্টেরলের মাত্রা কমায় যার ফলে হার্টের অসুখ হওয়ার সম্ভাবনা অনেক কমে যায়।রক্তে চর্বি কম জমে এর ফলে। একই সাথে এই পেয়ারা HDL নামক একটি কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়ায় যা কিনা হার্টকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে।
হার্টের জন্য উপকারি:
পেয়ারায় স্যাচুরেটেড ফ্যাট এবং কোলেস্টেরলের পরিমাণ কম। আবার ফাইবার এবং পটাশিয়াম সমৃদ্ধ। হৃদযন্ত্রের স্বাস্থ্য ভাল রাখে।
ব্রেস্ট ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা কমায়ঃ
লাইকোপেন(Lycopene), কোয়ারকেটিন(Quercetin), ভিটামিন সি এবং আরো কিছু পলিফেনল আছে যা কিনা শক্তিশালী এন্টি-অক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে আর এই এন্টি-অক্সিডেন্ট ক্যান্সার হওয়ার ঝুকি কমায়। বিশেষ করে প্রোস্টেট ক্যান্সার কমাতে অনেক সাহায্য করে পেয়ারা। আর সেই সাথে পেয়ারা খেলে মেয়েদের ব্রেস্ট ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে।
কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করেঃ
পেয়ারা একটি ফাইবার জাতীয় ফল আর তাই এটি খেলে কোষ্ঠকাঠিন্য দূর হয় আর তাই কারো ঠিকমত পায়খানা না হলে পেয়ারা খেয়েই করতে পারেন আপনার সমস্যার সমাধান।
ঠাণ্ডাজনিত যেকোনো সমস্যার সমাধানঃ
পেয়ারাতে আছে প্রচুর ভিটামিন সি এবং সাথে আয়রন যার কারণে এটি কফ দূরীকরণে অনেক বড় ভূমিকা পালন করে। কারো যদি কফ জমে যায় গলায় তাহলে সেক্ষেত্রে পেয়ারা খুব ভাল ওষুধ। এতে বিদ্যমান আয়রন, ভিটামিনসি শ্লেষ্মার মাত্রা কমিয়ে দিতে সক্ষম হয় এবং ঠাণ্ডাজনিত যেকোনো সমস্যার সমাধান দেয়।
পিয়ারা পাতার উপকারিতাঃ
পেয়ারার পাতায় আছে এন্টি-ইনফ্লামেটরি গুণ এবং খুব শক্তিশালি এন্টিব্যাক্টেরিয়াল ক্ষমতা আছে যা কিনা ইনফেকশনের সাথে যুদ্ধ করে এবং জীবানূ ধবংস করে। আর তাই পেয়ারার পাতা দাঁত ব্যথার জন্য খুব ভাল একটি ওষুধ,যা কিনা আপনি ঘরে বসেই দূর করতে পারবেন।
অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসাবে কাজ করেঃ
পেয়ারায় অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে যা ফ্রি র্যাডিক্যালের কারণে কোষকে ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে। পাশাপাশি দীর্ঘস্থায়ী রোগের ঝুঁকি কমায়।
এনার্জি লেভেল বাড়ায়ঃ
পেয়ারাতে ম্যাগনেসিয়াম থাকার কারণে এটি মাংশপেশিকে এবং নার্ভকে রিলাক্স রাখতে সাহায্য করে।আর তাই অনেক কাজ শেষে অথবা অনেকে স্ট্রেস নেয়ার পর একটি পেয়ারা খেয়েই আপনি আপনার এনার্জি লেভেলকে পারেন বাড়াতে ।পেয়ারাতে আছে ফলিক এসিড আর ফলিক এসিড একজন গর্ভবতী মায়ের জন্য খুবই প্রয়োজন।সব গর্ভবতীদেরই ডাক্তাররা ফলিক এসিড দিয়ে থাকেন কারণ এটি বাচচার নার্ভাস সিস্টেমকে উন্নত করে। আর সেই সাথে এটি বাচচাদের নিউরোলোজিক ডিজঅর্ডার থেকে দুরে রাখে।
ব্রেনের রক্ত সঞ্চালন বাড়ায়ঃ
পেয়ারাতে পাওয়া যায় ভিটামিন বি৩ এবং ভিটামিন বি৬ যা কিনা ব্রেনের রক্ত সঞ্চালনকে ভাল রাখতে সাহায্য করে।
মুখের সাদা দাগের মত ঘা সারাতে সাহায্য করেঃ
অনেকেরই মুখের ভেতর সাদা দাগের মত একটি আলসার দেখা যায় আর এটি হয়ে থাকে ভিটামিন সি এর অভাবে, তাই পেয়ারা খেলে এটি হওয়া অনেকটা কমে যায়। পেয়ারাতে গ্লুকোজের পরিমাণ কম থাকে আর তাই ওজন কমানোতে এটি বেশ ভাল একটি প্রতিষেধক। পেয়ারা ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাসের সাথে লড়াই করে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।
মহিলাদের মাসিককালীন পেট ব্যথা দ্রুত সারায়ঃ
আমাদের মাঝে এমন অনেক নারীরই মাসিককালীন পেট ব্যথা করে থাকে। প্রচন্ড ব্যথার কারণে কোনো উপায় খুঁজে না পেয়ে শেষ পর্যন্ত অনেকেই ব্যাথার ঔষধ সেবন করেন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, যদি কেউ পেয়ারার পাতা চিবিয়ে বা রস করে খায় তাহলে পিরিওডে হওয়া সেই ব্যথা দ্রুত সেরে যায়, সেইসাথে শরীরে কোনো পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া ফেলে না। আর তাই যারা প্রতিমাসে পিরিয়ডের ব্যথা নিয়ে অসহ্য যন্ত্রণায় ভোগেন তাদেরকে বলবো খাবারের তালিকায় এখনই পেয়ারাকে রাখার চেষ্টা করুন। কারণ, আপনাদের জন্য আদর্শ ফল হলো পেয়ারা এবং পেয়ারা পাতার রস, যা খুব সহজেই আপনার মাসিককালীন ব্যথা উপশমে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।

.png)
.png)
.png)
.png)
.png)
.png)
0 মন্তব্যসমূহ