আপেল হল একটি জনপ্রিয় ও সুস্বাধু ফল। তবে শুধু সুস্বাদু নয় পুষ্টিগুণেও ভরা৷ আপেল আমরা প্রিয়জনের বাড়িতে উপহার হিসাবে প্রদান করে থাকি, আবার জুস করে খাই। এছাড়া আপেলের অনেক রেসিপিও বিদ্যমান কিন্তু এসবের থেকেও যেটি সব চাইতে বেশি জরুরী, তা আমরা প্রায়ই ভুলে যাই! তাহলো- আপেলে প্রচুর পরিমানে ভিটামিন C, ফাইবার্ প্রোটিন, পটাশিয়াম, ফসফরাস, ভিটামিন সি ইত্যাদি যেগুলি আমাদের মানব শরীরের জন্য একান্ত প্রয়োজন। আজ আমরা আপেলের ১০টি উপকারিতা নিয়ে আলোচনা করবো।
আপেলের পুষ্টিগুণ (Nutritional value of apples):
খোসাসহ আপেলের খাদ্যযোগ্য প্রতি ১০০ গ্রাম অংশে রয়েছে – আপেলে প্রায় ৮০% পানি থাকে যা শরীরের জন্য অতীব দরকারি।
- খাদ্যশক্তি----- ৫২ কিলোক্যালরি
- শর্করা----- ১৩.৮১ গ্রাম
- চিনি ----- ১০.৩৯ গ্রাম
- খাদ্যআঁশ ----- ২.৪ গ্রাম
- চর্বি----- ০.১৭ গ্রাম
- আমিষ----- ০.২৬ গ্রাম
- জলীয় অংশ----- ৮৫.৫৬ গ্রাম
- ভিটামিন এ----- ৩ আইইউবিটা
- ক্যারোটিন----- ২৭ আইইউ
- লুটেইন----- ২৯ আইইউ
- থায়ামিন----- ০.০১৭ মিলিগ্রাম
- রিবোফ্লেভিন----- ০.০২৬ মিলিগ্রাম
- নিয়াসিন----- ০.০৯১ মিলিগ্রাম
- প্যানটোথেনিক অ্যাসিড----- ০.০৬১ মিলিগ্রাম
- ফোলেট----- ৩ আইইউ
- ভিটামিন সি----- ৪.৬ মিলিগ্রাম
- ভিটামিন ই----- ০.১৮ মিলিগ্রাম
- ভিটামিন কে----- ২.২ আইইউ
- ক্যালসিয়াম----- ৬ মিলিগ্রাম
- আয়রন----- ০.১২ মিলিগ্রাম
- ম্যাগনেসিয়াম----- ৫ মিলিগ্রাম
- ম্যাংগানিজ----- ০.০৩৫ মিলিগ্রাম
- ফসফরাস----- ১১ মিলিগ্রাম
- পটাশিয়াম----- ১০৭ মিলিগ্রাম
- সোডিয়াম----- ১ মিলিগ্রাম
- জিংক----- ০.০৪ মিলিগ্রাম
- ফ্লোরাইড----- ৩.৩ আইইউ
উৎস: ইউএসডিএ ফুডডাটা সেন্ট্রাল (USDA Food data Central)
আপেল খাওয়ার উপকারিতা (Benefits of eating apples):
আপেলের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের পুষ্টিগুন উপস্থিত। আপেল খাওয়ার মাধ্যমে শরীরে বিভিন্ন ধরনের উপহার হয় –
১. ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রন করে (Controls Diabetes):
বর্তমানে ডায়াবেটিসের সমস্যা হু হু করে বেড়েচলেছে। তাই, দিন যাচ্ছে ডায়াবেটিসের সংখ্যা বাড়ছে। ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমাতে প্রতিদিন একটি করে আপেল খাওয়া উচিত। প্রতিদিন একটি করে আপেল খেলে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি ২৮ শতাংশ কমে যায়। তাই ডায়াবেটিস থেকে রক্ষা পেতে নিয়মিত আপেল খাওয়ার অভ্যাস করুন।
২. হাঁপানি কমায় (Reduces Asthma) :
হাঁপানি কমাতে আপেল একটি উপকারী ফল। হাঁপানির তীব্রতা কম হওয়া নির্ভর করে আপেল খাওয়ার পরিমাণ এর উপর। ''Advances in Nutrition'' সংবাদ প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হয়েছিল যে, বিভিন্ন গবেষকরা আনুমানিক ৬৮ হাজার নারীকে নিয়ে একটি গবেষণা করেন, গবেষণার ফলাফল হিসেবে পাওয়া যায় যদি কেউ দিনে একটি আস্ত আপেল খায় তাহলে তার হাঁপানির তীব্রতা সবচেয়ে বেশি কমে যায়। এছাড়া দিনে একটি আপেলের ১৫ % খেলে হাঁপানি তীব্রতা কমে মাত্র ১০%।
৩.ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায় (Reduces the risk of Cancer):
আমারা জানি ক্যান্সার এমন একটি রোগ যেটি একবার কারো শরীরে বাসা বাঁধলে আর বাঁচার উপায় থাকে না। আর এই ক্যান্সার প্রতিরোধের সাহায্যকারী ফল হচ্ছে আপেল। আপেলের মধ্যে বিদ্যমান ফাইটোকেমিক্যাল ও আশের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট কোষের রক্ষা করার পাশাপাশি অস্বাভাবিক কোষ বিভাজনে বাধা দেয়। এছাড়া কোষের ক্ষয় রোধ করার পাশাপাশি কোষকে সুরক্ষা দেয়।
৪. ওজন নিয়ন্ত্রনে সাহায্য করে (Helps in weight control):
আপনার অতিরিক্ত ওজন নিয়ে চিন্তিত করার প্রয়োজন নেই। আপেলের মধ্যে প্রচুর
fiber থাকার কারণে ক্ষুধা কম লাগে। ফলে ঘন ঘন খাওয়ার অভ্যাস পরিবর্তন হয় এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে আসে। খাবার খাওয়ার কিছুক্ষণ আগে কয়েক টুকরা আপেল খেয়ে নিন। তাহলে শর্করা জাতীয় খাদ্য কম লাগবে। এছাড়া সকালের নাস্তায় প্রতিদিন আপেল রাখতে পারেন।
৫. রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় ( Increases immunity):
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য আপেল বেশ উপকারী ফল। বিভিন্ন রোগের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য প্রতিদিন সকালে একটি করে আপেল খান। আপেলে প্রচুর পরিমাণে প্রোটিন, পটাশিয়াম, ফসফরাস, ভিটামিন সি ইত্যাদি থাকার কারণে প্রতিদিন আপেল খাওয়ার অভ্যাস করলে দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অনেক বৃদ্ধি পায়।
৬. হার্টের ঝুঁকি কমায় (Reduces Heart risk):
আপেল বিভিন্ন পুষ্টিগুন সমৃদ্ধ হওয়ায় তা হার্টের ঝুঁকি কমায়। আপেলের মধ্যে ফাইবারের পরিমাণ ২.৪ গ্রাম, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের সাহায্য করে। এছাড়া আপেলের মধ্যে পটাশিয়াম ও ভিটামিন সি এর পরিমাণ অধিক পরিমাণে থাকায় হৃদরোগের সম্ভাবনা অনেকাংশে কমে যায়। নিয়মিত আপেল খেলে স্ট্রোকের সম্ভাবনা ২০% কমে যায়। তাই শরীরের পুষ্টির চাহিদা মেটাতে এবং হার্টের ঝুঁকি কমাতে নিয়মিত আপেল খাওয়ার অভ্যাস করুন।
৭. মানসিক সুস্বাস্থ্যে সাহায্য করে (Helps in Mental Health) :
নিয়মিত আপেল খেলে মস্তিষ্কের নিউরন গুলো বেশি কার্যকর থাকে। আপেলে বিদ্যমান বহুল পুষ্টি উপাদানের কারণে মস্তিষ্কের সুগঠন হয় এবং নিউরনের কার্যকারিতা সচল থাকে। ফলে মানসিকভাবে সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হওয়াটা অনেক সহজ হয়ে যায়।
৮. রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে উপযোগী (Useful in controlling blood pressure):
রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত আপেল খাওয়ার অভ্যাস করাটা খুবই জরুরী। কারণ আপেলে প্রচুর পরিমাণে পটাশিয়াম পাওয়া যায়। ১০০ গ্রাম সমপরিমাণ আপেলে পটাশিয়ামের পরিমাণ থাকে ১০৭ মিলিগ্রাম। যা দেহের রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। এছাড়া পটাশিয়াম দেহে তরলের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে। ইলেক্ট্রোলাইট ও অম্ল ক্ষারের ভারসাম্য, মস্তিষ্কে অক্সিজেন সরবরাহ ইত্যাদি কাজ পটাশিয়াম করে থাকে।
৯. ত্বকের সৌন্দর্য বাড়ায় (Enhances skin beauty):
আপেলের মধ্যে বিদ্যমান অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট (Antioxidants) ত্বকের তারুণ্য ধরে রাখতে সাহায্য করে। এছাড়া আপেলের মধ্যে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি। ভিটামিন সি ত্বকের কালো দাগ, ব্রণ দূর করতে সাহায্য করে এবং ত্বককে করে উজ্জ্বল ও মলিন।
১০. পাকস্থলীর সমস্যার সমাধান (Solution for stomach problems):
পেটের সমস্যা কমবেশি সবারই প্রতিনিয়ত লেগেই থাকে। না পারেন শান্তি খেতে, না পারেন ঘুমাতে, না পারেন কাজকর্ম করতে। হঠাৎ করে পেট খারাপ হয়ে যাওয়া, পেটে ব্যথা হওয়া, কোষ্ঠকাঠিন্য ইত্যাদি সমস্যায় পড়তে হয়। নিয়মিত আপেল খেলে অন্ত্রের এই সমস্যাগুলোর সমাধান হয়। কারণ আপেলের মধ্যে পাওয়া যায় পেকটিন (Pectin) নামক উপাদান। যা বদহজমের সমস্যা সমাধানে উপকারী।
আপেল খাওয়ার নিয়ে কিছু FAQ:
রাতে আপেল খেলে কি হয়?
রাতে আপেল খাওয়া ঠিক নয়। রাতে আপেল খেলে বদহজম বা হজমের সমস্যা এবং অন্ত্রের স্বাভাবিক ক্রিয়া ব্যাহত হতে পারে। রাতে আপেল খেলে গ্যাস্টিকের চাপ বেড়ে যেতে পারে। কারণ পাকস্থলীর অ্যাসিডকে আপেলের মধ্যে থাকা এসিড কিছুটা বাড়িয়ে তোলে। ফলের শরীরে অস্বস্তি সৃষ্টি হতে পারে। রাতে ও বিকেলে আপেল খাওয়া থেকে বিরত থাকুন।
খালি পেটে আপেল খেলে কি হয়?
সকালে খালি পেটে আপেল খেলে ভালো উপকার পাওয়া যায়। সকালে ঘুম থেকে উঠে খালি পেটে আপেল খাওয়া যায় অথবা কিছু পানি পান করার পর আপেল খান। এতে করে এসিডিটির সমস্যার সমাধান হবে। আপেলের খোসায় ফ্লাভোনয়েড কোয়ারসেটিন থাকার কারণে খালি পেটে আপেল খেলে শরীরের ফোলা ভাব কমে এবং প্রদাহ কমে। হার্টের সুস্থতার জন্য খালি পেটে আপেল খাওয়া যায়। এছাড়া আপেলে ভিটামিন সি পটাশিয়াম ও অন্যান্য উপাদান গুলোর কারণে হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বিশ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়।
আপেল খেলে কি গ্যাস হয়?
হ্যা, অতিরিক্ত আপেল খেলে গ্যাস হতে পারে। কারণ আপেলের মধ্যে যে এসিড থাকে তা পাকস্থলীর এসিডকে বাড়িয়ে দেয়। আপেল সমস্ত শরীরে পর্যাপ্ত অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এর যোগান দেয় এর ফলে অনেকেরই পেটে গ্যাসের সমস্যা সৃষ্টি হয়।
আপেলের বদলে কি খাওয়া যেতে পারে?
আপেলের বদলে পাকা পেয়ারা খাওয়া যায়। কারন আপেলের বিভিন্ন পুষ্টিগুণ পর্যাপ্ত পরিমাণে পাকা পেয়ারার মধ্যে পাওয়া যায়। গবেষকদের মতে আপেলের পরিবর্তে পাকা পেয়ারা খেলে আপেলের সমপরিমাণ না হলেও কাছাকাছি পুষ্টিগুণ পাওয়া যাবে।
আপেল খেলে কি ওজন বাড়ে?
নিয়মিত আপেল খেলে ওজন কমে যায়। বাড়তি ওজন দূর করতে চাইলে আপেল খেতে পারেন। আপেল খেলে অনেকক্ষণ পেট ভরা থাকে ফলে অনেক ঘন ঘন খাওয়ার অভ্যাস পরিবর্তন হয়। সেই সাথে মেদ ঝরে যায় এবং ওজন কমে যায়।








0 মন্তব্যসমূহ