টাইফয়েড জ্বরের কারণ, লক্ষণ, চিকিৎসা ও প্রতিকার | Typhoid fever-lakhan-karan-protikar

টাইফয়েড জ্বরের কারণে প্রতি বছরে সারা পৃথিবীতে ১০ মিলিয়নেরও বেশি মানুষ সংক্রামিত হচ্ছে, তাই এর মোকাবেলা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা এই বিস্তারিত আলোচনায় টাইফয়েড জ্বর হলে কিভাবে বাঁচতে পারি সে বিষয়ক আলোচনা করবো। যার মধ্যে থাকবে টাইফয়েড জ্বরের কারণ, কিভাবে রক্ষা পাওয়া যাবে, টাইফয়েড জ্বরের হলে কি করতে হবে বা কি খেতে হবে সব কিছু থাকবে এই আলোচনায়।


টাইফয়েড জ্বরের কারণ, লক্ষণ, চিকিৎসা ও প্রতিকার  Typhoid fever-lakhan-karan-protikar


আরো জানুনঃ ডেঙ্গু (DENGUE) জ্বর কী, কারণ ও প্রতিকার

টাইফয়েড জ্বরের লক্ষণ, প্রতিকার, কি কি খাওয়া উচিৎ, চিকিৎসাঃ

টাইফয়েড জ্বর নিয়ে আলোচনায় এই জ্বর কি? এর লক্ষণ, প্রতিকার, কি কি খাওয়া উচিৎ, চিকিৎসা বিষদ ভাবে জনার চেষ্টা করব-

টাইফয়েড জ্বর কি?

টাইফয়েড জ্বর হল ব্যাকটেরিয়া দ্বারা সংক্রামিত সংক্রমন যা সালমোনেলা এন্টারিকা সেরোটাইপ টাইফি ব্যাকটেরিয়া দ্বারা সৃষ্টি হয়ে থাকে। এটি দূষিত খাবার, জল, সংক্রামিত ব্যক্তির সাথে ঘনিষ্ঠতার মাধ্যমে ছড়িয়ে থাকে। সমস্ত পৃথিবীব্যপি টাইফয়েড নিয়ে উদ্বেগের কারণ তৈরি হয়ীছে। আপনার টাইফয়েড হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ঔষধ খাওয়ার সাথে সাথে নিয়মমাফিক খাওয়া-দাওয়া, সংক্রামিত ব্যক্তির সাথে ঘনিষ্ঠতার বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। তাই চলুন জেনে নেওয়া যাক যে টাইফয়েড জ্বর হলে কি কি করনীয় রয়েছে আমাদের।


টাইফয়েড জ্বরের কারণ, লক্ষণ, চিকিৎসা ও প্রতিকার  Typhoid fever-lakhan-karan-protikar


আরো জানুনঃ ম্যালেরিয়া রোগের লক্ষণ-প্রতিকার-চিকিৎসা | Malaria ke Lakshan


টাইফয়েড জ্বরের লক্ষণ:


টাইফইয়েড মূলত ঘন জনবসতিপূর্ণ এলাকায় বেশী হয়ে থাকে। বিশেষত বর্ষাকালে টাইফয়েড অধিক মাত্রায় লক্ষ্য করা যায়। শরীরে ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণের এক সপ্তাহ থেকে ৩০ দিন পর জ্বর, দুর্বলতা, পেটে ব্যথা, মাথা ব্যথা, ফুসকুড়ি, খিদে কমে যাওয়া, বমি বমি ভাব যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা যায়। গুরুতর ক্ষেত্রে সালমোনেলা টাইফি ব্যাকটেরিয়া অন্ত্রের ছিদ্রের মতো সমস্যা সৃষ্টি করে। শরীরে এই ব্যাকটেরিয়া আছে কি না জানার জন্য রক্ত, প্রস্রাব বা মল পরীক্ষা করা হয়ে থাকে। টাইফয়েড জ্বরের লক্ষণগুলি একনজরে নিচে দেওয়া হলো।

  • মাত্রাতিরিক্ত জ্বর। যা ১০৪ ডিগ্রি পর্যন্ত উঠতে পারে।
  • পেশী ব্যথা ।
  • গলা ব্যথা ।
  • প্রচণ্ড কাশি।
  • পেটে ব্যথা ।
  • মাথা ব্যথ।
  • দুর্বলতা ও ক্লান্তি।
  • ক্ষুধামন্দ।
  • ডায়রিয়া বা পাতলা পায়খানা ।
  • কোষ্ঠকাঠিন্য।
  • বুকে ও পেটে গোলাপি রঙের দানা দেখতে পাওয়া যায়।

টাইফয়েড জ্বরের কারণ, লক্ষণ, চিকিৎসা ও প্রতিকার  Typhoid fever-lakhan-karan-protikar


টাইফয়েড জ্বর ভালো করার উপায় বা প্রতিকার কি? টাইফয়েড জ্বর হলে কি কি খাওয়া উচিত:


  • টাইফয়েড হলে আপনাকে অধিক পরিমানে জল খাওয়ার সাথে সাথে তরল খাবার (ডাবের জল, যে কোনো ফলের জুস, স্যুপ, হার্বাল চা, শরবত ইত্যাদি) খাওয়া উচিত। এছাড়াও নিম্নলিখিত খাবার অ নিয়ম গুলি পালন করা উচিৎ।
  • ফল, শাকসবজি, আয়রন এবং ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবার খাওয়া উচিত। টাইফয়েডের মতো রোগ আমাদের শরীরে দেখা দিলে নানান অসুবিধার সাথে সাথে শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে ও হজম শক্তি কমে যায়। আসুন জেনে নিই টাইফয়েড জ্বর হলে কি কি খাওয়া উচিত।
  • টাইফয়েডে জ্বর এবং ডায়রিয়ার মতো লক্ষণ গুলির কারণে সৃষ্ট ডিহাইড্রেশন হাত থেকে বাঁচার জন্য প্রচুর পরিমানে বিশুদ্ধ জল, (ডাবের জল, যে কোনো ফলের জুস, স্যুপ, হার্বাল চা, শরবত ইত্যাদি পান করুন।
  • ভিটামিন সি যুক্ত খাবার ( ডাবের জল, পাতিলেবু-পুদিনার শরবত, টাটকা ফলের রস (প্যাকেটবন্দি নয়) খাওয়া খুব জরুরী। কারণ ভিটামিন সি আমাদের ইমিউনিটি ক্ষমতা বাড়াতে সাহাজ্য করে যা ওই ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া প্রতিহত করতে পারে।
  • সহজে হজম হবে এমন খাবার বা সবজির পাতলা ঝোল বা স্যুপ করে খেতে পারেন, যার ফলে শরীরে হাইড্রেশন বজায় রাখতে সাহায্য করবে।
  • টাইফয়েডে জ্বর হলে প্রচুর পরিমানে ফল, ফলের রস খাওয়া দরকার।
  • টাইফয়েডে জ্বরে সহজে হজম হবে এমন প্রোটিন খেতে হবে, যেমন-চামড়াহীন, হাড়বিহীন মুরগি মাংস বা অন্যান্য প্রোটিন যুক্ত খাবার খেতে পারেন। কারণ এই খাবারগুলি পাচনতনে সাহায্য করে।
  • টাইফয়েডে দুগ্ধজাত খাবার এড়িয়ে চলা ভালো, কারণ এই খাবারগুলি আপনাকে ডায়রিয়া দিকে নিয়ে যেতে পারে। আপনার সুস্থ্য হওয়ার পরে দুগ্ধজাতীয় খেতে পারেন।
  • খাবার কম কম করে খান, অন্যথায় বমি বার হজমে অসুবিধা হতে পারে।
  • অ্যালকোহল ও ক্যাফিন জাতীয় খাবার এড়িয়ে চলুন। কারণ অ্যালকোহল ও ক্যাফিন শরীরকে ডিহাইড্রেট করতে পারে যার ফলে ডায়রিয়াও হতে পারে।
টাইফয়েড জ্বরের কারণ, লক্ষণ, চিকিৎসা ও প্রতিকার  Typhoid fever-lakhan-karan-protikar

শিশুর টাইফয়েড জ্বর হয়েছে বুঝবেন কি করে? বা শিশুর টাইফয়েড জ্বরের লক্ষণ:


টাইফয়েড একটি মারাত্মক রোগ যা দূষিত খাবার ও পানির মাধ্যমে ছড়ায়। এটি সালমোনেলা টাইফি নামক ব্যাকটেরিয়া দ্বারা সৃষ্ট হয়। শিশুদের মধ্যে টাইফয়েডের লক্ষণগুলি হল- উচ্চ জ্বর, মাথাব্যথা, শরীরে ব্যথা, ক্ষুধা হ্রাস, ওজন হ্রাস, শুকনো কাশি, ঘাম, পেটে ব্যথা, পেটে ফুলে যাওয়া, ডায়রিয়া বা কোষ্ঠকাঠিন্য এবং চুলকানি বা ফুসকুড়ি হতে পারে।

টাইফয়েড নির্ণয়ের ক্ষেত্রে উপরিক্ত লক্ষণ গুলি দেখে বুঝতে হবে। যেহেতু শিশুরা বড়োদের মতো সকল লক্ষণ বলতে পারবে না, সে ক্ষেত্রে আপনাদের টাইফয়েড জ্বরের লক্ষণ বুঝে নিতে হবে। ৬ দিন পর্যন্ত জ্বর না কমলে দাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে। যদিও ডাক্তার বাবু আপনাকে রক্ত পরীক্ষা করতে বলবেন! রক্ত পরীক্ষায় সাধারণত রক্তের সালমোনেলা টাইফির ও কালচার পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত করবেন। টাইফয়েড সাধারণত ওষুধের মাধ্যমে নিরাময় করা যেতে পারে এবং এক্ষেত্রে অবশ্য ডাক্তারের পরামর্শে ওষুধ খেতে হবে।

টাইফয়েড জ্বরের কারণ, লক্ষণ, চিকিৎসা ও প্রতিকার  Typhoid fever-lakhan-karan-protikar

টাইফয়েড প্রতিরোধের উপায়:


টাইফয়েড প্রতিরোধের জন্য সঠিক স্বাস্থ্যবিধি বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ। টাইফয়েড এড়াতে এখানে কিছু নিয়ম পালন করা উচিৎ। তা নিম্নে দেওয়া হল: 
  • রাস্তার খাবার এড়িয়ে চলুন
  • শুধুমাত্র ফিল্টার করা জল পান করুন
  • টাইফয়েড জ্বর হয়েছে এমন ব্যক্তির থেকে দূরত্ব বজয় রাখুন।
  • তরল জাতীয় খাবার (ফলের জুস, স্যুপ, হার্বাল চা, শরবত ইত্যাদি) গ্রহণের পরিমাণ বাড়াতে হবে।
  • সবসময় আপনার হাত ধুয়ে নিন।
  • টাইফয়েড-প্রবণ এলাকায় যাওয়ার পরিকল্পনা করলে টিকা নিন।

ইফয়েড জ্বরের কারণ, লক্ষণ, চিকিৎসা ও প্রতিকারে কিছু FAQs যা আপনি জানা দরকার! 

১. টাইফয়েড এ কি কি খাওয়া যায় ?


  • প্রচুর পরিমানে জল পান করতে হবে।
  • শাকসবজি ভালোভাবে রান্না করে খাওয়া উচিত।
  • সহজেই হজমযোগ্য খাবার (ভাত, প্লেইন পাস্তা, প্লেইন সেদ্ধ আলু এবং ওটমিল ইত্যাদি) খান।
  • হাড়বিহীন, চামড়াবিহীন মুরগির মাংস খাওয়া উচিত। সেদ্ধ করা মাংস প্রোটিনের উৎস প্রদান করে
  • ভালোভাবে ধুয়ে খোসা ছাড়ানো ফল খান, যেমন-কলা, আপেল ইত্যাদি।

২. টাইফয়েড জ্বর হলে কি মাংস খাওয়া উচিত ?


হাঁ, টাইফয়েড জ্বর হলে মাংস খাওয়া উচিত কারণ এই রোগে আমাদের শরীরে প্রোটিনের মাত্রা কমতে থাকে, শরীর দুর্বল হয়ে যায়। কিন্তু কাঁচা বা কম রান্না করা মাংস খাওয়া এড়িয়ে চলুন, কারণ এই ধরণের মাংস সালমোনেলা সহ ব্যাকটেরিয়া দূষণের ঝুঁকি বহন করে। তাই টাইফয়েড জ্বর হলে চর্বিবিহীন, হাড়বিহীন মাংস ভালোভাবে রান্না করে খাওয়া উচিত। এছাড়া যদি ঘৃণা কেউ খায় সে ক্ষেত্রে বমি হতে পারে। সাবধান!

৩. টাইফয়েড জ্বর চিকিৎসার কতদিন পর থাকে ?


টাইফয়েড রুগীরা চিকিৎসা শুরু করার এক সপ্তাহের মধ্যে বেশির ভাগ ভালো হতে শুরু করে। টাইফয়েড জ্বরের চিকিৎসার জন্য অ্যান্টিবায়োটিকের আদর্শ কোর্স সাধারণত ১০ থেকে ১৪ দিন হয়। আপনার চিকিৎসকের দ্বারা নির্ধারিত অ্যান্টিবায়োটিকের কোর্সটি সম্পন্ন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। টাইফয়েড জ্বরের সময় চিকিৎসক একটি নির্দিষ্ট খাদ্যতালিকা দেবেন, যেটি অনুসরণ করা গুরুত্বপূর্ণ। সামগ্রিকভাবে, টাইফয়েড জ্বর থেকে সম্পূর্ণ সুস্থ হতে বেশ কয়েক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে।

৪. টাইফয়েড থেকে দ্রুত সুস্থ হওয়ার উপায় ?


  • আপনার ডাক্তারের নির্দেশ মেনে ওষুধ নিয়মমাফিক খান।
  • ডিহাইড্রেশন প্রতিরোধে প্রচুর পরিমানে জল ও তরল খাবার খান।
  • যথেষ্টভাবে বিশ্রাম নিন।
  • সহজে হজমযোগ্য খাবার খান, যেমন-ভাত, সেদ্ধ শাকসবজি এবং ভালোভাবে রান্না করা চর্বিহীন মাংস।
  • খাওয়ার আগে ভালো করে হাত ধোয়ার অভ্যাস করুন।
  • সংক্রমণের বিস্তার রোধ করতে ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি বজায় রাখুন।

৫. টাইফয়েড হলে বারবার জ্বর আসে কেন ?

আসলে জ্বর কোন রোগ নয়! এটা আপনাদের জানতে ও মানতে হবে। কারণ, আমাদের শরীরে যখন কোন ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাস প্রবেশ করে তখন আমাদের শরীরে থাকা ইমিউনিটি সিস্টেম তাকে আটকানোর চেষ্টা করে ফলে দুজনের মধ্যে সংঘর্ষের ফলে আমাদের শরীরে তাপ উৎপন্ন হয়। আর সেটা কে আমারা জ্বর বলি। যাইহক যদি টাইফয়েড জ্বরে আক্রন্ত একজন ব্যক্তি চিকিৎসকের নির্ধারিত অ্যান্টিবায়োটিকের কোর্স সম্পূর্ণ না করেন, তাহলে টাইফয়েড সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়া শরীর থেকে সম্পূর্ণ রূপে নির্মূল নাও হতে পারে। এর ফলে সংক্রমণের পুনরাবৃত্তি হতে পারে এবং বারবার জ্বর আসে।
কিছু ব্যক্তি সুস্থ হওয়ার পরেও টাইফয়েড ব্যাকটেরিয়ার দীর্ঘস্থায়ী বাহক হতে পারে, যার ফলে বারবার জ্বর আসে।
টাইফয়েড জ্বর সালমোনেলা টাইফি ব্যাকটেরিয়ার দ্বারা সৃষ্ট হয় এবং ব্যক্তিরা যদি দূষিত খাবার, জল ও ব্যাকটেরিয়া বহনকারীর সংস্পর্শে আসে তবে তারা পুণরায় সংক্রমিত হয় এবং আবারও জ্বর ফিরে আসে।

দয়া করে মনে রাখবেন যে এই আলোচনায় টাইফয়েড জ্বর কি? এর লক্ষণ, প্রতিকার, কি কি খাওয়া উচিৎ, চিকিৎসা বিষদ ভাবে জানানোর চেষ্টা করা হল। আপনার এই সকল পরামর্শ গুলি যদি নিয়ম মেনে চলতে পারেন, তাহলে অবশ্য উপকৃত হবেন। তবে আমার স্বাস্থ্য ব্লগে স্বাস্থ্য বিষয়ক পরামর্শ প্রদান করা হয় কিন্তু চিকিৎসা পরামর্শের বিকল্প নয়। তবে, আপনার যদি উপরের সমস্যার সম্মুখীন হন তাহলে অবশ্য অনুগ্রহ করে একজন ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করুন। আর এই সকল তথ্য বিভিন্ন নামী অভিজ্ঞ চিকিৎসকের এবং www.healthline.com, www.nhs.uk, www.webmd.com, দ্বারা উৎসায়িত ও তথ্য নির্ভর করে লেখা হয়েছে। এই সকল তথ্য আপনার যদি উপকারে আসে তাহলে আমাদের এই সকল প্রয়াস সফল হবে। যদি আপনাদের কোন আদেশ বা অনুরোধ থাকে অবশ্য করে কমেন্টে জানান। ধন্যবাদ।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ